রুনা আক্তার, বিএসসি
পাতিলঝাঁপ, নবাবগঞ্জ, ঢাকা।
২০১৭ সাল, আজ থেকে প্রায় আট বছর আগের কথা। গ্রীষ্মকালের ছুটি শেষ হয়েছে তখন। মে মাসের শেষের দিক কিংবা জুন মাসের শুরু, এমন সময়ই হবে। আমি তখন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সেদিন ছিলো সোমবার। দিনটির কথা এখনও বেশ পরিষ্কার ভাবেই মনে আছে। সকাল থেকেই আকাশ কেমন যেন কালো মেঘে ঢেকে ছিলো । চারদিক ছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, কেমন যেন থমথমে ঘুমোট একটা পরিবেশ। আমি সকাল ৯টার কোচিং শেষ করে শীঘ্রই বাসায় ফিরে এসেছি। কোন একটা ছুটির কারণে হয়তো কলেজ বন্ধ ছিলো। এরপর বেলা তখন ১১টায় গড়ালো। আমি ঘরে বসে ফোন চালাচ্ছিলাম তখনও। ঠিক তখনই হঠাৎ বাইরে থেকে কারো ডাকাডাকির শব্দ কানে এলো। বুঝলাম বাইরে দাড়াঁনো কেউ ঘরের ভিতরের কাউকে উদ্দেশ্য করে ডাকছে। যেহেতু বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই, অতএব মোবাইল রেখে বাইরে এলাম। এসে দেখি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। তখন খুব একটা ভালো করে দেখা হয়নি তাকে, তারপরেও যতটুকু মনে আছে, সে দেখতে খুব বেশি লম্বাও না আবার খুব বেশি খাটোও না, অর্থাৎ মধ্যম আকারের। গায়ের রঙ উজ্জ্বল, চোখ দুটো ছোটো ছোটো গোলগাল, চুলগুলো এলোমেলো, ঠোঁট দুটো কোমল কিংবা পাতলা। সামান্য দৃষ্টি বিনিময়ের পর আমি কিছু বলতে যাবো, তার আগেই সে বলে ওঠলো, রাবেয়া বেগম আছেন? ওনাকে ডাকুন তো।
বুঝলাম সে আমার মায়ের খোঁজ করছে। হয়তো কোনো অফিশিয়াল কাজে এসেছে। কিন্তু তিনি তো বাসায় নেই। অতএব আমি জবাবে বললাম, তিনি তো বাসায় নেই।
সে বললো, আমি কারিতাস অফিস থেকে এসেছি। আজকে ওনার কিস্তি ছিল।
আমি বললাম, আচ্ছা আপনি বসুন তবে, আমি দিচ্ছি।
তবে আমার কথা শেষ হতে না হতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো মুহুর্তেই। বৃষ্টির এত তেজ যে কয়েক ফোঁটা পড়তেই তার গায়ের পোশাকে জলছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠলো। তাই আমি তাকে বারান্দায় ডেকে বললাম, আপনি বারান্দায় এসে বসুন, আমি কিছু মনে করবো না।
বারান্দায় ঢুকে সে নিঃসংকোচে পাশের প্লাস্টিকের টুল টেনে তাতে বসলো। আমি ওতশত না ভেবে ঘরে গেলাম টাকা আনতে। আলমারি খুলে টাকা বের করে গুনতে গুনতে মিনিট খানেক সময় গেলো। এরপর বাইরে গিয়ে তার পাওনা পরিশোধ করে হিসেব বুঝে নিয়ে একটুও দেড়ি না করেই ফের ঘরে ঢুকে বসলাম। তবে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ ক্রমে যেন বেড়েই চলেলো। জানলায় দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম বৃষ্টির বেগ যেন বায়ু আর জলে ভারী হয়ে অগত্যা বেড়েই চলেছে। তখন আমার বাইরে বসা অতিথির কথা মাথায় আসলো, একটু সহানুভূতিও জাগলো। কিস্তির স্যার হোক কিংবা যে কেউ অতিথি তো। আর আমরা বাঙালিরা তো বরাবরই অতিথিপ্রিয়। অতএব একটু আপ্যায়ন না করলে কি আর চলে? তবে আমি এটা বুঝতে পারছিলাম না কি দিয়ে করবো তার মেহমানাদারি! ঘরে তো তেমন কিছুও নেই দেবার মতো। নুডুলস আছে, তবে রান্নায় বেশ ঝামেলা। এক কাপ চা দেওয়া যায়, তবে সাথে দেবার মতো মুড়ি ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। তাই ভাবলাম একটা আম কেটে দেই বরং, টাটকা গাছপাকা আম।
ভেবেছিলাম সে কিনা কি মনে করবে, তবে আম খেতে দেওয়ায় সে যে ভীষণ খুশি হলো সেটা তার মুখ দেখেই বুঝে ফেললাম। হয়তো সে এমনটা আশা করেনি।
তখনও তেমন কোনো কথোপকথন হয়নি আমাদের মাঝে। ওদিকে বাইরে বৃষ্টি তার নিজস্ব ছন্দে নেচে চলেছে। একবার জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম সে টেবিলে রাখা খবরের কাগজটা নিয়ে পড়ছে।
একটুপর বৃষ্টির গতি কমতে লাগলো। আমি একবার কি মনে করে বারান্দায় এলাম। সে মাথা তুলে স্বচ্ছ গলায় বললো, আম খাওয়া শেষ তো, প্লেটটা নিয়ে যান।
আমি প্লেটটা তুলতেই সে মলিন হেসে বললো, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এবার আমি আসি, বৃষ্টি এখন কমে গেছে। ছাতা আছে আমার কাছে।
আমি কথা না বাড়িয়ে এক কথায় জবাব দিলাম, ঠিক আছে। এরপর দেখলাম সে ওঠানের রাস্তাটি ধরে চলে যাচ্ছে।
সময় চলে গেলো আরও দুইদিন। সকাল থেকে সন্ধ্যে বাসায় তেমন কোনো কাজ নেই মোবাইল চাপা ছাড়া, তাই সেটাই করছিলাম। রাত আটটা নাগাদ মায়ের নাম্বারে কার একটা কল এলো জানিনা। একটুপর শুনি মায়ের গলা, সে আমায় ডাকছে। আমি যাওয়ার পর সে বললো, কারিতাসের স্যার কল করেছে, তোর সাথে একটু কথা বলতে চায়। হয়তো পড়াশোনার বিষয়ে কোনো টিপস দিবে।
কথা বলার তেমন কোনো আগ্রহ আমার ছিলো না, তার উপর অপরিচিত লোক। কি নিয়ে কথা বলতে সেটাও আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তাই একটু ইতস্তত লাগছিলো। তবুও ফোনটা কানে নিয়ে প্রথমেই তাকে সালাম দিলাম। জবাবে সে সালামের উত্তর দিয়ে সেই সাথে কিছুটা কুশল বিনিময় করার জন্য বললো, "
"কেমন আছেন?" আমি স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম, "জী ভালো। আপনি?"
"আমিও ভালো আছি। আচ্ছা আমায় চিনতে পারলেন তো? ওই যে সেদিন আপনি আমাকে আম কেটে খাওয়ালেন না! আমি সেই।"
আমি তাকে চিনেছি আগেই। তবুও অবাক হবার ছলে কিছুটা টেনে টেনে বললাম, "ওহ, আচ্ছা। আপনি! কিছু বলবেন?"
"আপনাকে ধন্যবাদ।"
"এতো ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু হয়নি।"
"আপনি কোন কলেজে পড়েন যেন?"
"হাসনবাদ গার্লস কলেজে "
"ওহ, প্রতিদিন ক্লাস?"
"সপ্তাহে ৬ দিন।"
"আচ্ছা"
"হুমম, ভালো থাকেন তাহলে। "
"আপনিও ভালো থাকুন।
কথা বলা শেষ করে আমি উঠে নিজের রুমে চলে আসলাম। আমি কিছুতেই মিলাতে পারছি না হঠাৎ উনি আমার সাথে কেন কথা বলতে চাইলো। যাক সেসব কথা। পরেরদিন ঠিক একইসময়ে আবারও অনিক স্যারের কল। আজ ও উনি আম্মার কাছে আমার খোঁজ করছেন। মা আমাকে ডাকছে , যাওয়ার পর শুনলাম উনি আমার সাথে কথা বলতে চায়। ২-৩ মিনিটের কথোপকথন শেষ করে আমি রুমে এসে পড়তে বসলাম। আসলে সেদিন পড়ায় মন বসছিলো না। ফোনে উনি ওপার থেকে আজও সেই একই বুলি আওড়ালেন,, আমি নাকি তাকে আম খাইয়ে জাদু করেছি। উনি কোনোভাবেই সেই বৃষ্টির দিনে প্রথম দেখা,সেই রিনিঝিনি কণ্ঠে প্রথম কথা বলা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। আমার মায়াবী চোখের চাহনি নাকি তাঁর হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। সে বলছিলো সে আমাকে আরও কিছু বলতে চায়, কিন্তু এখন বলতে পারছে না।সে আগামীকাল আবার কল করবে এই বলে রেখে দিলো। এবার আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন রহস্যজনক মনে হচ্ছে। আর এমনিতেও কেউ এইরকম ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বললে তাঁর আসল উদ্দেশ্য জানার জন্য আমার ভীষণ কৌতূহল জন্মায়। অনিক স্যারের বেলায় ও তাই হলো। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম উনার মনের মধ্যে আসলে কি চলছে সেটা আমাকে জানতেই হবে। কি বলতে চায় উনি, কেনোইবা বারবার আমার সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। তাহলে কি আমি যা ধারণা করছি এটাই ঠিক? ভীষণ অস্থিরতা অনুভব করছি, আমার মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। সেদিন আর কিছুতেই ঘুম আসছিলো না। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে কলেজে চলে গেলাম। মনটা বেশ ফুরফুরে, ভিতরে ভিতরে অস্থিরতা কাজ করলেও বাহিরে সেটা প্রকাশ করিনি। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো,কোচিং শেষে বাসায় ফিরলাম। আজ বাসায় এসে প্রথমেই কল হিস্ট্রি চেক করলাম। না তাঁর নাম্বার থেকে কোনো কল আসেনি। সন্ধ্যার পর বই খুলে বসেছি, কিন্তু পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছি না। আজ আম্মার মোবাইলটা আগেই আমার কাছে এনে রেখেছি। যেন লজ্জায় পড়তে না হয়। হঠাৎ ই রিং বেজে উঠলো। কল রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এলো কেমন আছেন? উত্তর দিলাম আমি ভালো আছি, আপনি? উত্তরে সে বললো আমিও ভালো আছি। কি করছেন এখন?
-এইতো পড়তে বসেছি। আপনি?
-আমি আর কি করবো, আপনার কথাই ভাবছি।
-মুচকি হাসলাম। রাতে খেয়েছেন?
-না এখনো খাইনি। আপনি খেয়েছেন?
-না।
-আচ্ছা আমি আপনাকে তুমি করে বলতে পারি
- হ্যাঁ, অবশ্যই।
- -কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতে চাই তোমাকে!
- -জী বলুন। আমি কিছু মনে করবো না।

ছবিঃ সংগৃহীত
- -সেদিনের প্রথম দেখায় আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।তোমার চোখের মায়ায় পড়ে গেছি।সেদিনের পর থেকে আমার মন অস্থির হয়ে আছে। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি লাইফে কারো প্রতি এমন আকর্ষণ অনুভব করিনি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর থেকে জানিনা কি হয়েছে আমার।আমার মন ব্যাকুল হয়ে আছে তোমার উত্তর শোনার জন্য।
-.... কিছু বলছো না যে, রাগ করলে?
-না। শুনছি আপনার কথা। বলুন।
-আসলে আমি অতো গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা। তাই এলোমেলোভাবেই খোলা মনের কথাগুলো প্রকাশ করলাম।
এবার তুমি কিছু বলো!
-কি বলবো আমি!
-তুমি আমার সাথে প্রতিদিন একটু কথা বলতে পারবে?
-কি কথা?
-এমনি। আচ্ছা তুমি যেন কোন বিভাগ নিয়ে পড়ো ?
-বিজ্ঞান বিভাগ।
-বাহ্!তাহলে তো তুমি খুব ভালো ছাত্রী।
-মোটামুটি। আচ্ছা আপনার বাসা কোথায় জানতে পারি?
-আমার বাসা গাজীপুর।
-বাসায় কে কে আছে আপনার?
-মা, বাবা, ভাই ও বোন সবাই আছে।

ছবিঃ সংগৃহীত।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেলো। ফোনে তেমন কথা না হলেও মোবাইলে চ্যাটিং হতো। সে আমাকে সুন্দর একটা নাম দিয়েছিলো। "রোজ" বলে ডাকতো সে আমাকে। এই নাম কেন দিলেন জিজ্ঞেস করায় সে বলেছিলো টাইটানিক মুভির নায়িকার নাম ছিল "রোজ",, আমিও তোমাকে রোজ নামেই ডাকবো।যেন আমাদের ভালোবাসাও ওদের মতোই অমর হয়ে থাকে। প্রেমে পড়লে মানুষ নাকি তখন কবি হয়ে যায়।অনিককে দেখে আমারও তাই মনে হচ্ছে। তাঁর কথা বলার ধরণ খুব সুন্দর আর মার্জিত ছিল, আর তাঁর কণ্ঠ ও মাশাআল্লাহ।প্রতিনিয়ত সে আমাকে টেক্সট করতো। সকালে রাতে " I Love You Rose",, "Good Morning Rose","Good Night Rose" লেখা মেসেজগুলো ইনবক্সে জমা হতে লাগলো। সে বলতো আমি তোমার সাথে দাঁড়িয়ে অজস্র সকাল উপভোগ করতে চাই। পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙার পর তোমাকে সামনে দেখতে চাই। এমন দিন কি সত্যিই আসবে? এরকম কত শত স্বপ্নের কথা, ইচ্ছার কথা সে আমাকে বলতো। সে আমাকে রোজ দেখার বাহানা করতো। কিন্তু আমি বখাটেদের মতো রাস্তা দাঁড়িয়ে থাকাকে ভালো মনে করিনা। তাই সবসময় না করে দিতাম। তবুও সে মাঝেমধ্যে আমার চলতি পথে লুকিয়ে থাকতো, আমাকে এক নজর দেখবে বলে। সে আমার কলেজে যাওয়া-আসার সময়টা জানতো। তাঁর কলিগরা বলতো কি ব্যাপার অনিক স্যার! আজকাল খুব খুশি খুশি দেখি,, ঘনঘন আয়না দেখেন, মনে খুব ফুর্তি মনে হচ্ছে? কারো প্রেমেটেমে পড়েছেন বুঝি! অনিক শুধু হাসতো। বলতো বয়স তো এখনই, প্রেম করলে সমস্যা কি। জুলাই মাস চলে এলো। আমার বান্ধবীর জন্মদিন উপলক্ষে আমরা ৪ বান্ধবী মৈনট ঘাট (পদ্মা নদীর তীর) গেছি, নদীর ধারে বসে কেক কাটবো বলে। অনিক সেদিন লম্বা সময় ধরে আমার সাথে ফোনে কথা বলে সময় পাড় করছিলো। তাঁরও আমাকে নিয়ে মৈনট ঘাটে ঘুরতে আসার শখ,আমার হাত ধরে নদীর পাড়ে হাটবে, একসাথে সূর্যাস্ত দেখবে এরকম কতশত শখের কথা সে আমাকে ফোনের ওপার থেকে জানালো । হঠাৎ ই পথের মাঝে কাদা পানি পড়লো আমাদের।অনিক বলে উঠলো আমি থাকলে আমার রোজকে কাদা পানিতে হাঁটতে দিতাম না।
-আমি বললাম তো কি করতেন শুনি?
-সে বললো আমি তোমায় কোলে তুলে পাড় করে দিতাম।
আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না। তাঁর কথায় বিমোহিত হয়েছি।চোখের সামনে একবার সেই দৃশ্য কল্পনা করে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেললাম।কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলেই মুচকি হাসলাম।আসলে মানুষটার কথার মতো তাঁর স্বপ্নগুলোও সুন্দর। সে আমাকে নিয়ে কয়েকবার ঘুরে বেড়াতে চেয়েছে, আমি না করে দিয়েছি।অনিকের সাথে পরিচয়ের প্রায় দের মাস কেটে গেলো। সে আমাকে পড়াশোনার সুবিদার্থে খবরের কাগজের পড়াশোনার অংশ কেটে আমার জন্য নিয়ে আসতো। আমার মায়ের কাছে দিয়ে বলতো সে যেন আমাকে দেয়। সে মানসিক দক্ষতা যাচাইয়ের বই ঘেটে ঘেটে আমাকে বিভিন্ন সম্পর্ক বিষয়ে প্রশ্ন করতো। ছোটবেলা থেকেই সম্পর্কের নাম,কে কার কি হয় এগুলোতে আমি পাকা। তো অনিক আমাকে প্রশ্ন করলে আমি কয়েক মুহূর্তেই উত্তর দিতে পারতাম। সে আমার মেধার খুব প্রশংসা করতো। বলতো আমি আশীর্বাদ করি এবং বিশ্বাস করি তুমি জীবনে ভালো কিছু করবে। অনেক বড় হও।
একদিন আমি তাঁর বিয়ে প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম। তো সে বলেছিলো তাঁর বাসার একটু কাজ চলছে, কাজটা শেষ হলেই সে বিয়ের কথা বলবে। আমি বললাম সে তো খুব ভালো কথা। সে আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তাঁর বাবা মাকে দেখাবে বলে। আমি বলেছিলাম তাঁরাই যেন আসে। আমি ভাবছিলাম যে আমার মা বিষয়টা জানতে পারলে সে কিভাবে দেখবে? অনিক বললো সে ঠিক ম্যানেজ করে নিবে। একদিন হঠাৎ সে আমার ফেইসবুক আইডি তলব করছিল। আমি আইডির নাম বললাম ঠিকই কিন্তু আমার এন্ড্রোয়েড ফোন তখন নষ্ট। আইডিতে আসতে পারতাম না।সে বললো রিকোয়েস্ট দিয়েছি, একসেপ্ট করে দিও।বান্ধবীর মোবাইল দিয়ে আইডি লগইন করলাম, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট চেক করতে গিয়ে প্রোফাইলে তাঁর ছবি দেখেই চিনে ফেললাম। কিন্তু আইডির নাম দেখে ভড়কে গেলাম।নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। তাঁর বায়োডাটা ঘেটে দেখলাম সত্যিই তাই। বড্ড দেরি করে ফেলেছি, তাঁর কথার ভাঁজে এমনভাবেই পড়েছি যে এই বিষয়টা তখন মাথায় ই আসেনি। সত্যিই তো কখনো জানা হয়নি। তাঁর আইডির নাম "Axoy Kumar" অর্থাৎ সে একজন সনাতনী। বায়োডাটা এই কথাই সাক্ষী দিচ্ছে। নিমিষেই আমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি আইডি লগআউট করে দিলাম। সেদিনের বাকি ক্লাসগুলোতে আমি অন্যমনস্ক ছিলাম। বাসায় আসার পর তাঁর অনেক কল আসছে, আমি দেখছি কিন্তু রিসিভ করছি না। কেন জানি মেনে নিতে পারছি না। অবশেষে রিসিভ করলাম। সে বললো তুমি আমার রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করেছো দেখলাম। আমি বললাম হ্যাঁ করেছি বান্ধবীর ফোন দিয়ে। আমি আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারলাম না। বললাম আপনার নাক অক্ষয়? বললো হ্যাঁ, কেন কি হয়েছে?
-আমি বললাম তাহলে সবাই যে আপনাকে অনিক বলে ডাকে!
-এটা আমার ডাকনাম। কেন সুন্দর না?
-হ্যাঁ ২টা নামই সুন্দর।
-তাই বুঝি। Thank You Rose.
-আপনি তো সনাতনী, তাহলে হাতে লাল সুতো, গলায় তুলসীর মালা এগুলো পড়েন না কেন?
-এগুলো আমার ভালো লাগেনা তাই পড়িনা।
-দেখুন আমি তো মুসলিম, আমার মনে হয় আপনার আমাকে নিয়ে বেশি ভাবা উচিত হবেনা।
-হঠাৎ এই কথা কেন বলছো রোজ?
-বাস্তবতা মেনে নিতে বলছি। আমরা ২ জন ২ ধর্মের। আপনার স্বপ্ন কোনোদিনই সত্যি হবেনা।
-আমি তো সব জেনেই তোমাকে ভালোবেসেছি, দয়া করে এভাবে বলে আমাকে কষ্ট দিওনা।
-আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, কিন্তু এটাই তো সত্যি।
-আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রোজ, আমি তোমাকে স-সম্মানে আমার জীবনসঙ্গী করতে চাই।
-আচ্ছা পরে কথা বলবো। ভাল থাকুন বলে লাইনটা কেটে দিলাম।
আসলে ভিতরে ভিতরে আমিও কষ্ট পাচ্ছিলাম।কিছুদিন কথা বলায় তাঁর প্রতি একটা টান বসে গেছে। তাঁর বলা কথাগুলো বারবার কানে বাজতে লাগলো। সে আমাকে কল, মেসেজ করেই যাচ্ছে। আমি দেখছি কিন্তু কোনো রেসপন্স করতে ইচ্ছে করছে না। পরেরদিন তাঁর সাথে কথা বললাম সে আমার এমন ব্যবহারে ভেঙ্গে পড়েছে, খুব কষ্ট পাচ্ছে। অনিক বলছিলো আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রোজ, জীবনে প্রথম কোনো মেয়েকে ভালোবেসেছি। কোনোদিন কারো প্রতি এতো আকর্ষণ অনুভব করিনি, আমি অনেক লাজুক স্বভাবের ছিলাম। মেয়েদের সাথে কথা বলতে পারতাম না। তোমার সাথেই প্রথম এতো খোলাখুলি নিজের মনের কথা বলেছি। তুমি আমাকে ভুল বুঝ না দয়া করে। তুমি আমাকে যা যা করতে বলবা আমি তোমার জন্য তাই করবো।তবুও আমাকে ইগনোর করিও না।তুমি এড়িয়ে চললে আমার খুব খারাপ লাগে।
কিন্তু আমি কি বলবো। আমি যে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। মন ভেঙ্গে গেছে আমার। এটা ভেবে খারাপ লাগছে যে আমি আগে কেন জিজ্ঞেস করলাম না। শুরুতে জানলে আজ কারোরই এতো খারাপ লাগতো না।সত্যিই বুঝতেই পারিনি সে যে সনাতনী। কথায় বার্তায় চালচলনে এমন কিছু ছিল না যাতে বুঝা যাবে সে যে মুসলিম নয়। আমি তাকে ইচ্ছা করে কষ্ট দিতে চাইনি। অনেকদিন ধরে কথা বলায় তাঁর একটা আলাদা টান বসে গেছে আমার প্রতি। কিন্তু যে করেই হোক আমাকে এসব বন্ধ করতে হবে। আমি জানি ধর্মান্তরিত হওয়া অন্যায়। সবাই যার যার আপন জায়গাতেই সুন্দর। সে ঝোকের মাথায় আমার সব কথা মেনে নিবে বলছে হয়তো। কিন্তু আমি বুঝে শুনে তাকে দিয়ে এটা করাতে পারিনা। বিবেক সায় দিচ্ছে না। তাছাড়া এভাবে বিয়ে করলে ২ পরিবারের ই মান সম্মান নষ্ট হবে। সমাজের লোকেরা কটু কথা শোনাতে ছাড়বে না। আর তাছাড়াও এতে করে ২ জনেরই ক্যরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। সবকিছুই ওলোট পালট হয়ে যাবে। যদি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন ই করতে না পারলাম তাহলে ওকে ধর্মান্তরিত করে কি হবে। কোথায় গিয়ে মাথা গুজবো।
এতো শত চিন্তার ভিড়ে মন স্থির করলাম এই ভেবে যে আমি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত জেনেও তাকে সামান্য সুখের লোভ দেখিয়ে বিপদে ফেলতে পারিনা। সাময়িক কষ্ট হয়তো মানিয়ে নিতে পারবো, খারাপ লাগবে জানি। তবুও চেষ্টা করলেই পারবো। যোগাযোগ কমিয়ে দিলাম।
অনিকের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিলাম। সে বিরত নেই, প্রতিদিন মেসেজ লিখতো। ২/৪ টার উত্তর দিতাম নয়তো না। কল দিলেও সবসময় ধরতাম নাহ।
আমার মনে হয় ভালোবাসা দূর থেকেই সুন্দর। ভালোবাসা বেশি প্রকাশ করলে ভালোবাসা হারিয়ে যায়। আমি জানিনা আমি তাকে ভালোবাসতাম কিনা তবে আজও তাঁর বলা কথাগুলো আমার কানে বাজে। "রোজ রোজ " বলে ডাকার কথা মনে পড়ে। মনে পড়লে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। একটা সুন্দর অনুভূতি হয় আমার। কেউ একজন আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। যার চোখে সাজানো ছিল আমাকে নিয়ে অজস্র স্বপ্ন। সবই ঠিক ছিল, শুধু পূর্ণতা পায়নি। এটাই জীবন। জানিনা সে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। মানুষটা আমার পাশে নেই সত্যি কিন্তু আমার জীবনের কোথাও না কোথাও একটা রেশ রয়ে গেছে। সত্যিই কি আমিও তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম?
-কোনো উত্তর নেই।
............................
..................................
...........................................
. ভালো থাকুক আমার ভালোবাসার মানুষগুলো।
-ইতি
তোমার প্রিয়তমা রোজ ![]()