
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (PR): ভোটের অনুপাতে আসন, জনগণের ক্ষমতায়ন
মো: রুবেল বেপারী
সাংবাদিক ও লেখক
গণতন্ত্র মানে হলো জনগণের শাসন, জনগণের হাতে ক্ষমতা এবং জনগণের মতামতের প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় কি সত্যিই জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়? আমরা ভোট দেই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের প্রতীককে কেন্দ্র করেই প্রার্থী বিজয়ী হন। একজন জনপ্রিয় প্রার্থী যদি দলের নমিনেশন না পান, তবে তিনি আসলে ভোটারদের আস্থার উপর নির্ভর করতে পারেন না। এভাবেই দলীয় নেতৃত্ব আমাদের উপর প্রার্থী চাপিয়ে দেয়। ফলে জনগণ অনেক সময় বলে, “আমরা দলের মার্কায় ভোট দেই, নেতাকে নয়।”
এ সমস্যার সমাধান হতে পারে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (Proportional Representation—PR)।
—
PR-এর মূল ধারণা
PR হলো এমন একটি ভোটিং পদ্ধতি যেখানে যে দল বা প্রার্থী যত শতাংশ ভোট পাবে, তারা সংসদে সেই শতাংশ আসন পাবে। বর্তমানের First-Past-The-Post (FPTP) ব্যবস্থায় যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পান তিনিই নির্বাচিত হন, অন্যদের ভোট অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু PR-এ প্রতিটি ভোটের মূল্য আছে, কারণ প্রতিটি ভোট সংসদে আসন ভাগাভাগিতে প্রভাব ফেলে।
ধরুন, একটি নির্বাচনে—
দল A পেয়েছে ৪০% ভোট → সংসদের ৪০% আসন
দল B পেয়েছে ৩৫% ভোট → সংসদের ৩৫% আসন
দল C পেয়েছে ২০% ভোট → সংসদের ২০% আসন
দল D পেয়েছে ৫% ভোট → সংসদের ৫% আসন
এভাবে ভোটের শতাংশ অনুযায়ী আসন বণ্টন করা হলে ছোট দলও সংসদে জায়গা পাবে, বহুমতের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হবে এবং সংসদ হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
—
PR-এর ধরন
১. Closed-list PR
এখানে দল একটি তালিকা দেয়। ভোটাররা শুধু দলকে ভোট দেয়। ভোটের শতাংশ অনুযায়ী তালিকার উপরের প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হন।
এতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বেশি, ভোটারের ক্ষমতা কম।
২. Open-list PR
ভোটার দলকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট প্রার্থীকেও পছন্দ করতে পারে। ফলে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এতে ভোটারের ভূমিকা বাড়ে এবং দলীয় চাপ কিছুটা কমে।
৩. Mixed-Member Proportional (MMP)
এটি এক ধরনের সংমিশ্রণ। কিছু আসন সরাসরি ভোটে হয়, কিছু আসন পার্টি তালিকা থেকে দেওয়া হয়।
এতে স্থানীয় প্রার্থী নির্বাচনের সুযোগ থাকে, আবার জাতীয়ভাবে ভোটের অনুপাতও প্রতিফলিত হয়।
—
কেন PR জরুরি?
বর্তমানে সংসদ প্রায় পুরোপুরি একক দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিরোধী দল দুর্বল হয়ে পড়ে। জনগণের ভোটের একটি বড় অংশ কার্যত হারিয়ে যায়। PR ব্যবস্থায়—
ছোট দলও সংসদে থাকবে,
বিরোধীদল শক্তিশালী হবে,
জনগণের প্রতিটি ভোটের মূল্য থাকবে,
দলীয় প্রভাব কমে আসবে।
একটি বিল পাশ করতে হলে সরকারকে বিরোধীদলের সাথে সমঝোতা করতে হবে। ফলে একক আধিপত্য নয়, বরং আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
—
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে PR
বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০০ সাধারণ আসন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয় এবং ৫০ সংরক্ষিত নারী আসন দলগুলোর ভোট অনুপাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাকে আংশিকভাবে PR-এর নমুনা বলা যায়। কিন্তু এখানে ভোটার সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে না।
যদি পুরো সংসদ PR পদ্ধতিতে গঠিত হয়, তবে—
ভোটাররা বুঝবে তাদের ভোট হারায়নি,
জনপ্রিয় কিন্তু দলীয় নমিনেশন না পাওয়া ব্যক্তিরাও সুযোগ পেতে পারে (open-list হলে),
সংসদ হবে ভারসাম্যপূর্ণ,
একক আধিপত্য ভেঙে যাবে।
তবে এটাও সত্য— PR চালু হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কমতে পারে। জোট সরকার গঠনের প্রবণতা বাড়বে। তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি হতে পারে। আবার ভোট গণনার প্রক্রিয়াও কিছুটা জটিল।
—
ভোটারের ক্ষমতায়ন
আপনি যখন বলেন, “আমরা দলের মার্কায় ভোট দেই, নেতাকে নয়,” তখন সেটি বাস্তবতার প্রতিফলন। তবে PR ব্যবস্থায় ভোটার সরাসরি প্রভাব রাখতে পারে সংসদের গঠনে। উদাহরণস্বরূপ, আপনার এলাকায় প্রার্থী হেরে গেলেও আপনার ভোট জাতীয়ভাবে গণনা হবে এবং সংসদে প্রতিফলিত হবে।
—
উপসংহার
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (PR) বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সহজ নয়, তবে এর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জনগণের প্রতিটি ভোটের মূল্যায়ন করতে চাইলে, বহুমতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে এবং বিরোধীদলকে শক্তিশালী করতে চাইলে PR হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প।
এটি গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক করবে। তবে একইসাথে দলীয় স্বজনপ্রীতি রোধ, স্বচ্ছ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও ভোটারদের সঠিক তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা না করলে PR-ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।
সুতরাং, প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি প্রস্তুত এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য, যেখানে প্রতিটি ভোটের মূল্য সমান, প্রতিটি কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন সংসদে?
—
✍️
মো: রুবেল বেপারী
সাংবাদিক ও লেখক
সিরাজদিখান, মুন্সীগঞ্জ
ই-মেইল: robelbapare@gmail.com